img

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে একটি কার্যকর সামরিক জোট বা ‘ইসলামিক ন্যাটো’ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। 

একদিকে যখন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর নীতির কারণে অস্তিত্ব সংকটের মুখে, তখন অন্যদিকে রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা একটি নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জোট গঠনের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘ইসলামিক ন্যাটো’র এই ধারণাটি মূলত সৌদি আরবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ৪৩ জাতির ‘ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেরোরিজম কোয়ালিশন’-এর একটি উন্নত সংস্করণ। 

গত বছর কাতারে ইসরাইলি হামলার পর আরব দেশগুলো তাদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া কৌশলগত প্রতিরক্ষা সমঝোতা এবং পরবর্তীতে তাতে তুরস্কের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা এই জোটের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মূল চালিকাশক্তি ও সদস্য রাষ্ট্র

বিশ্লেষকদের মতে, একটি কার্যকর ইসলামিক ন্যাটো গড়ে উঠতে তিনটি প্রধান শক্তির সমন্বয় প্রয়োজন। 

সৌদি আরবের বিশাল অর্থভাণ্ডার, যা জোটের রসদ ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের জোগান দেবে। পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি, যা জোটের জন্য একটি শক্তিশালী সামরিক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করবে। এছাড়া তুরস্কের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও রণকৌশল, যারা ন্যাটো সদস্য হিসেবে আধুনিক যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী।

লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটর এবং মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদন বলছে, এই জোট গঠনের পথে প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থা ও স্বার্থের ভিন্নতা। কাতার ও আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো অনেক ক্ষেত্রে মিশরের প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাধা দিয়েছে, যা আরব বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে স্পষ্ট করে।

আবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজ এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বাস্তবতা বদলে দিতে পারে। তবে ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে অন্য এক আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছে। তাদের মতে, সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক জোটের বিপরীতে ভারত-ইসরাইল-আমিরাত একটি বিকল্প নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফাঁদ না কি প্রতিরক্ষা দেয়াল? অনেকে মনে করেন, এই জোটটি শেষ পর্যন্ত ‘ইরানবিরোধী’ একটি জোটে পরিণত হতে পারে, যা আসলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের স্বার্থ রক্ষা করবে। যদিও ইরান নিজেও তার মিত্রদের (হিজবুল্লাহ, হাশদ আল-শাবি, হুতি) নিয়ে একটি পাল্টা ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বা ন্যাটো-সদৃশ ব্যবস্থা গড়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেতৃত্বের সংকট ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতির কারণে সেই সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও অনিশ্চয়তা 

‘ইসলামিক ন্যাটো’র মূলনীতি হবে ন্যাটোর মতোই—‘কোনো এক সদস্য দেশের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা’। কিন্তু বাস্তবে ৪৩টি মুসলিম দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও আদর্শিক ভিন্নতা এতই বেশি যে, ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো একটি একক কমান্ডের অধীনে আসা অত্যন্ত জটিল। তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইসরাইলি আগ্রাসন যেভাবে বাড়ছে, তাতে অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নেতৃত্বে অন্তত একটি ‘মিনি ন্যাটো’ গড়ে ওঠা সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, ‘ইসলামিক ন্যাটো’ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা এখন আর কেবল তাত্ত্বিক পর্যায়ে নেই। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের শুরু দিকের ঘটনাবলী ইঙ্গিত দিচ্ছে, একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও লোহিত সাগর থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত এক নতুন প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তোলার প্রক্রিয়া পর্দার আড়ালে চলমান।

এই বিভাগের আরও খবর